মারন ব্যাধি কারোনা ভাইরাসে বিধ্বস্ত পুরো বিশ্ব। এর বাইরে নেই বাংলাদেশও। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। বাংলাদেশও রয়েছে চরম ঝুঁকিতে।
এ অবস্থায় লক্ষ্মীপুরের আতঙ্কগ্রস্থ জনগণ অধিকাংশ জনপ্রতিনিধিদের তাদের কাছে পাচ্ছে না। স্থানীয় ৪ এমপিসহ জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে রয়েছেন। এ সঙ্কট চলাকালে ২৮মার্চ পর্যন্ত তাদের নির্বাচনী এলাকায় দেখা যায়নি।
উপকূলীয় এ জেলার দরিদ্র মানুষ চরম অর্থ সংকটে রয়েছে। খাদ্যের অভাবে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক পরিবারে নিরব কান্না চলছে। জনপ্রতিনিধি এবং সামাজের বিত্তবানরাও যেন তাদের কান্না শুনছেন না। লক্ষ্মীপুরের ৪ টি সংসদীয় এলাকায় ৪ জন সংসদ সদস্য (এমপি) থাকলেও তারা এ সংকটময় সময়ে এলাকায় নেই। তবে অনুসারিদের মাধ্যমে খোঁজ খবরের পাশাপাশি তারা নামমাত্র সাহায্য সহায়তা করছেন।
আর জেলার ৫৮ টি ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ১৮ জন চেয়ারম্যান করোনা সচেতনতায় শুরু থেকে সক্রিয়ভাবে মাঠে কাজ করছেন। অন্যরা যেন ঘুমে রয়েছেন। পাশাপাশি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য, ৫ টি উপজেলার মধ্যে ৪ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, ৪ টি পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলদের অধিকাংশ গাছাড়া ভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সচেতন লোকজন অভিযোগ করেছেন।
জনপ্রতিনিধিরা প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন এবং আওয়ামী জোটের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। অথচ জনগণের সুখ-দুঃখে একসঙ্গে থাকা এবং কাজ করার অঙ্গীকার দিয়ে তারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন আরো নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও ওইসবের কোন বাস্তবায়ন নেই।
তবে সদরের উপজেলা চেয়ারম্যান এ কে এম সালাহ উদ্দিন টিপু ও রায়পুরের ভাইস চেয়ারম্যান এ বি এম মারুফ বিনা জাকারিয়া করোনা থেকে জনগণকে রক্ষা করতে এক সপ্তাহ ধরে হাট-বাজার, মাঠ-ঘাট, বাসা-বাড়িতে প্রচার-প্রচারণার করছেন। তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসহায়দের বাড়ি বাড়িতে চাল, ডাল, আলুসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩-৪ দদিন ধরে জেলা সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় কারোনার কারণে অঘোষিত নকডাউন চলছে। মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, আতংক বিরাজ করছে। বাংলাদেশে করোনার প্রার্দুভাব দেখা দেওয়ার পর লক্ষ্মীপুর ১ (রামগঞ্জ) আসনের এমপি আনোয়ার হোসেন খান, লক্ষ্মীপুর ৪ (রামগতি ও কমলনগর) আসনের এমপি আবদুল মান্নান এলাকায় আসেননি।
লক্ষ্মীপুর ২ (রায়পুর ও সদরের একাংশ) আসনের এমপি কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের বিরুদ্ধে গত মাসের মাঝামাঝিতে মানবপাচারসহ দুর্নীতির অভিযোগে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। তখন তিনি ঢাকায় থাকলে কিছুদিন পর কুয়েত চলে যান। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশে নেই। তবে কোন দেশে অবস্থান করছেন তা নিশ্চিত করতে পারছেন না তার অনুসারীরাও।
লক্ষ্মীপুর ৩ (সদর) আসনের এমপি এ কে এম শাহজাহান কামাল ৮/১০ দিন আগে জেলা ছাত্রলীগের মাধ্যমে জেলা শহরে করোনার সচেতনতামূলক কিছু লিফলেট ও মাস্ক বিতরণ করেছেন। এরপর তিনি ঢাকায় গেলেও এলাকায় আর আসেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্য বয়সি এক বাসিন্দা বলেন, ‘এমপিরা ভোট চানের লাই আঙ্গো কাছে আইয়ে। হিয়ার হরে আর আঙ্গো কাছে আইয়ে না। কোন খবরও লয় না। অসুখ-বিসুখের ডরে অন আর নাই। গত ক’দিন কোন কাম নাই, হোলাহাইন লই অনেক কস্ট হাইতাছি’।
রায়পুর উপজেলা পরিষদ সড়কে শায়েস্তানগর গ্রামের রিকশা চালক সাহাব উদ্দিন বলেন, ভোট আইলে নেতারা সব দি হালায়। এহন খবর নাই। রাস্তায় মানুষও নাই। হেডের তো আর লকডাউন নাই। খাইতে তো আইবো।
এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংগঠক ও জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘরের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এম এ রহিম বলেন, জাতির এ দুর্যোগময় সময়ে জনপ্রতিনিধিরা জনগণ থেকে দুরে থাকাটা দুঃখজনক। বর্তমানে ভেদাভেদ ভুলে আমরা সবাই সবার অবস্থানে থেকে জনগণের সঙ্গে থেকে এ বিপদকালীন সময় মোকাবেলা করা প্রয়োজন। যেন মানুষ এবং মানবতা জয়ী হতে পারে। রায়পুর উপজেলার পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মারুফ বিন জাকারিয়া বলেন, জনগন সব সময় আমাদেরকে কাছে চায়।
যে কোন বিপদের সময় আরো বেশি পাশে চায়। দায়িত্ব এবং নিজের মানবিকবোধ থেকে জনগণের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি। কোন মানুষ যেন খাদ্যে কষ্ট না পায়, সেটিও আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখছি। সদরের এমপির প্রতিনিধি বায়োজীদ ভূঁইয়া বলেন, এমপি ডাক্তার, ফায়ার সার্ভিস, সাংবাদিকদের জন্য করোনা সুরক্ষা পোষাক, মাস্কসহ সরঞ্জাম পাঠিয়েছেন। তিনি সার্বক্ষনিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। অসহায়দের সহযোগিতা করতেছি।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সালাহ উদ্দিন টিপু বলেন, আমি সবসময় জনগনের জন্য কাজ করি। করোনার কারণে অন্য জনপ্রতিনিধিরা যখন নিজেদের ঘুটিয়ে নিয়েছে। আমি তখন বিরামহীনভাবে মানুষকে সচেতন করতে ছুটে চলছি। রাতে শ্রমজীবী মানুষ, যারা দিন এনে দিন খায় -তাদের ঘরে ঘরে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
সবাই একযোগে কাজ করলে আমরা যে কোন দুর্যোগ থেকে মুক্তি পাবো। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, করোনার কারণে প্রতিটি ইউনিয়নে একটন করে চাল বরাদ্ধ দিয়েছে সরকার। এসময় ১০ হাজার টাকা করে প্রত্যেক ইউনিয়নে দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে ওই চাল বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে করোনায় শনিবার পর্যন্ত ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন ৪৮ জন। এরমধ্যে ১৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কাজল কায়েস, বিশেষ প্রতিনিধি






