স্কুলছাত্রী কুলসুমকে পাঠানো হলো সৌদি, ফিরল লাশ

প্রকাশঃ

উন্মে কুলসুম। বয়স ১৪ বছর। ছিলেন সপ্তম শ্রেনীর ছাত্রী। ২০১৮ সালে দালালের প্ররোচনায়, অভাবের সংসারের ঘানি টানতে গৃহকর্মীর কাজে সৌদি আরব পাঠানো হয় কিশোরী কুলসুমকে। দু’বছর পর, দেশে ফিরলেন কুলসুম। তবে জীবিত নয়, কফিনে মোড়ানো লাশ হয়ে।

শনিবার (১২সেপ্টেম্বর) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গুনিয়াউক ইউনিয়নের নূরপুর গ্রামে তার লাশ পৌঁছায়।

এ সময় বৃদ্ধ মা–বাবা, বোন, স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্না-আহাজারীতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে। অসহায় এ দরিদ্র এই পরিবারে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

পরিবারের অভিযোগ, অনৈতিক কাজে রাজি না হওয়ায় সৌদি গৃহকর্তা ও তার ছেলে কিশোরী কুলসুমের দুই পা, হাত ও কোমর ভেঙ্গে দেয়। এরপর একটি চোখ নষ্ট অবস্থায় তাকে রাস্তায় ফেলে গেলে সৌদি পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের কিং ফয়সাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

কিশোরী কুলসুম নূরপুর গ্রামের শহিদুল ইসলাম ও নাসিমা বেগমের মেয়ে। তার বাবা সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ের নায়েব ছিলেন। ২০ বছর আগে তিনি অবসরে যান। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে কুলসুম দ্বিতীয়। অভাবগ্রস্ত কুলসুমের পরিবারের এখন পাঁচজন সদস্য রয়েছে। প্রবাসে পাড়ি জমানোর সময় কুলসুম নূরপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালে প্রাথমিক নূরপুর লাহাজুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয় কুলসুম। সনদপত্র অনুযায়ী সেখানে তাঁর জন্মতারিখ ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর।

পরিবারও বলছে, ২০০৬ সালেই জন্ম মেয়েটির। কিন্তু তাঁর পাসপোর্টে জন্মতারিখ উল্লেখ করা ১৩মার্চ ১৯৯৩। বিদেশে পাঠানোর জন্য এজেন্সি ও দালাল মিলে পাসপোর্ট বানায়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে যে জন্মসনদ দেওয়া হয় তাতে তাঁর জন্মসাল দেখানো হয় ১৯৯৩। এটাকে ভিত্তি করেই তার পাসপোর্ট করা হয়। অথচ মেয়েটির বড় বোনের বয়স এখনো ১৫।

গত ২৪ জুন মেয়েটিকে অত্যাচারের অভিযোগ এনে নাসিরনগর থানায় তারা স্থানীয় দালাল আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ করেন।

প্রতিবেশী দালাল রাজ্জাকের কথায় ২০১৮ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকার ফকিরাপুলের মেসার্স এমএইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে গৃহকর্মীর কাজ দিয়ে কিশোরী কুলসুমকে সৌদিআরবের রিয়াদে পাঠান। বেতন কম দেওয়াসহ রিয়াদের মালিকপক্ষ কিশোরী কুলসুমকে শারিরীক নির্যাতন করে।

ওই কিশোরীকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে ১০হাজার টাকাও নেন রাজ্জাক। বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে কুলসুমের কোনো সন্ধ্যান দিবে না বলে হুমকি দেন রাজ্জাক। পুলিশের কাছে বার বার গিয়েও কোনো প্রতিকার পায়নি তার পরিবার। নির্যাতনের ভিডিও লাইভে দেখালেও তারা বিশ্বাস করেননি।

এ বছরের ১৭ আগস্ট ঢাকায় জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালকের কাছে একটি অভিযোগ দেন। তাতে বলেন, এমএইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশলের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান কুলসুম। কিন্তু ঠিকমতো বেতন পাননি। এরপর শারিরীক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হতে থাকেন। মেয়েকে ফিরিয়ে আনার জন্য বারবার যোগাযোগ করা হলেও এজেন্সি সাড়া দেননি।

এরপর তারা জানতে পারেন যে বাড়িতে কাজ করতেন সেই বাড়ির নিয়োগকর্তা ও তার ছেলে এপ্রিল মাসে মারধর করে তাঁর দুই পা, হাত ও কোমর ভেঙ্গে, একটি চোখ নষ্ট অবস্থায় তাকে রাস্তায় ফেলে গেছে। এরপর সৌদি পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তিন মাস পর গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের কিং ফয়সাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কুলসুমের মৃত্যু হয়। এরপর লাশ ফিরিয়ে আনার অনুরোধ ও বিচারের দাবি করে পরিবার।

নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ টি এম আরিচুল হক বলেছেন, বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো কাগজ স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা আছে। আর সৌদি চিকিৎসকও মৃত্যুর কারণটি এটি লিখেছেন। তবে পুলিশ স্থানীয় দালালদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

কুলসুমের মা নাসিমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘রমজান মাসের শেষ রোজার দিন দুপুর ফোন করে তাদের জানানো হয় মেয়ে হাসপাতালে আছে। তারা তখন জানতে পারেন মালিকের খারাপ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মারধর করে ফেলা রাখা হয়।

এরপর কোরবানি ঈদের পরদিন মেয়ের সঙ্গে হাসপাতালে শেষ কথা হয়। তখন পরিবারের কাউকে চিনতে পারেনি কুলসুম। কারও কথারও উত্তর দিতে পারেনি।’

নিজস্ব প্রতিবেদক/এমআর

সর্বশেষ খবর

ঘুমাচ্ছিলেন চালক: মাইক্রোবাস খালে, প্রাণ গেল ৭ জনের

0
নিজস্ব প্রতিনিধি: ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দূর্ঘটনায় একই পরিবারের সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার ভোরে এমন মর্মান্তিক দূর্ঘটনা...

জনপ্রিয় খবর